সিজোফ্রেনিয়া একটি মানসিক রোগ

120 39 total views

সিজোফ্রেনিয়া একটি মানসিক রোগ || ডাঃ মোহাম্মদ ফিরোজ

সিজোফ্রেনিয়া একটি তীব্র মাত্রার মানসিক অসুখ। আমেরিকার মতো উন্নত দেশে প্রায় ২-৫ মিলিয়ন লোক অর্থাৎ ২৫ লাখ লোক এ মানসিক অসুখটিতে ভুগছেন। পরিসংখ্যানটি একবারে অধুনাপ্রাপ্ত। এ মানসিক অসুখটিতে ব্যক্তির চিন্তা করার প্রক্রিয়া, আবেগ-অনুভূতির প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিকভাবে ব্যক্তির আচরণের উপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এটি এমনই একটি ডিঅর্ডার যে ব্যক্তির বাস্তব এবং কল্পনা বা অবাস্তবের মাঝে পার্থক্য নিরুপণ করতে পারে না, যৌক্তিকভাবে চিন্তা ভাবনা করতে পারে না এবং তাদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ অস্বাভাবিক হয়ে থাকে। সিজোফ্রেনিয়া যেমন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে কষ্ট দিয়ে থাকে তেমনি পরিবার ও সমাজের অন্যান্য সদস্যরাও এতে কষ্ট পেয়ে থাকেন। বেশির ভাগ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী সমাজ, কর্মস্থল, স্কুল, কলেজ ইত্যাদিতে সুষ্টুভাবে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে না। পরিবারের সদস্যদের উচিত তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। যতকিছু বলা হোক না কেন, সিজোফ্রেনিয়া রোগ সম্পূর্ণভাবে সারিয়ে তুলতে পারে এমন ঔষধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। যেটি সম্ভব সেটি হলো উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা যারা নিয়ে নেয় তারা সুস্থ এবং কর্মময় জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারে।

দোষ আপনার নয়!

সমাজে প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, অসুখটি বুঝি ব্যক্তিগত দূর্বলতা বা খন্ডিত ব্যক্তিত্বের অধিকারীদের হয়ে থাকে। মনে রাখা দরকার এটি চারিত্রিক কোনো বৈশিষ্ট নয়। এ অসুখে যারা ভোগে তাদের কানে যেমন গায়েবি আওয়াজ আসতে পারে, ঠিক তেমনি এবং অনেক ভ্রান্ত বিশ্বাসে ভুগে থাকে। কাজেই দেখা গেছে সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার পিছনে আপনি নিজে দায়ী নন, এটা একটি তীব্র মাত্রার চিন্তন প্রক্রিয়ার রোগ। যা ব্যক্তির দৈনন্দিন কর্মকান্ডকে বিঘ্নিত করতে পারে। ব্যক্তির পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, পেশাগত এবং রাজনৈতিক তথা রাষ্ট্রীয় ক্ষতি এতে সাধিত হয়ে থাকে।

তাহলে কেন এ রোগ হয়!

সিজোফ্রেনিয়া নামক অসুখটি কেন এ নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক রয়েছে। সোজাসাপটাভাবে বলতে গেলে এর জন্যে একক কোনো কারণ দায়ী নয়। বংশগত কারণের পাশাপাশি প্রাণ রসায়নগত কারণ, পরিবেশগত কারণ, আর্থ-সামাজিক কারণ ইত্যাদি সব কিছু এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

জেনেটিকস বা বংশগত কারন

মনোবিজ্ঞানীরা বহু বছরের গবেষনায় দেখতে পেয়েছেন যে, যে সকল পরিবারে এ জটিল মানসিক রোগের ইতিহাস রয়েছে, সে সকল পরিবারের পরবর্তী জেনারেশনের কারো কারো মাঝে অসুখটি পরিলক্ষিত হয়েছে। পরিবেশগত নানা কারণ দিয়েও সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যেমন ভাইরাস সংক্রমণ অথবা অত্যন্ত মনোদৈহিক চাপজনিত অসুখের কারণে অথবা এ দু’য়ের সমন্বয়ে অসুখটি দেখা দিতে পারে। অন্যান্য বংশগত অসুখের মতো এই সিজোফ্রেনিয়া অসুখটিতেও শরীরের হরমোন পরিবর্তন এবং একই সাথে শারীরিক কিছু পরিবর্তন হয়ে থাকে।

প্রাণ রসায়নগত কারণ

জেনেটিকসের সহায়তায় জানা গেছে, মস্তিস্ক সংবাদ পরিবহনের জন্যে কতগুলো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে থাকে। ফলশ্রুতিতে এসকল রাসায়নিক পদার্থের মাঝে ভারসাম্যতা পরিলক্ষিত হয়। উল্লেখ থাকে যে, এগুলোকে আমরা নিউরোট্রান্সমিটার বলে থাকি। এগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। ডোপামিন নামক যে নিউরোট্রান্সমিটার বা রাসায়নিক মৌল অনু রয়েছে তা মস্তিষ্কের এক কোষ থেকে অন্য কোষে সংবাদ পরিবহণ করে থাকে। যে ভারসাম্যহীনতা এই রোগে পরিলক্ষিত হয় তাতে করে ব্যক্তির মস্তিষ্ক উদ্দীপকের প্রতি অন্যভাবে প্রতিক্রিয়ান্বিত হয়। ফলশ্রুতিতে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগী সংবেদী উদ্দীপনায় স্বাভাবিক ব্যক্তির চেয়ে অনেক বেশি পরিমানে উদ্দীপিত হয়ে পড়তে পারে। এই যে এতো বেশি উদ্দীপনা বা মস্তিষ্কের অতি কার্যকরিতা তা ফলশ্রুতিতে হ্যালুসিনেশন (কোনো গায়েবী আওয়াজ শোনা, চোখে এমন কিছু দেখা যা অন্য কেউ দেখছে না, অন্য কোনো উদ্দীপক না থাকা স্বত্বেও নাকে কোনো গন্ধ শোকা) অথবা নানা ধরণের ভ্রান্ত বিশ্বাস বিরাজমান থাকে।

গর্ভাবস্থায় জটিলতা এবং জন্ম

কতক গবেষক দাবি করেন যে, ভাইরাসজনিত ইনফেকশন, গর্ভাবস্থায় অপরিমিত পুষ্টি অথবা যাদের জন্মকালীন সময়ে জটিলতা দেখা দেয় তাদের ক্ষেত্রে সিজোফ্রেনিয়া রোগ জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে দেখা দেয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

মানসিক অসুখটি হলে কি করবো?

সিজোফ্রেনিয়া রোগের সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা হলো ড্রাগ বা ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা। তাই অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীকে চিকিৎসা করাতে হবে। বর্তমানে এ রোগ চিকিৎসার জন্যে অনেক ভালো ভালো ঔষুধ যেমন- ওয়ালজেপিন, সিজোপিন, সিজোর্ডন, ক্লোরপ্রমাজিন ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো দিয়ে চিকিৎসায় ব্যক্তি তার দৈনন্দিন কর্মকান্ড এবং পেশাগত জীবন মোটামুটি সুস্থভাবে চালিয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি সমর্থনমূলক সাইকোথেরাপি দিলে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব আরো উন্নত হয়।

কিভাবে বুঝবো অসুখটিতে আক্রান্ত হলাম?

আপনার মাঝে যদি নিম্নলিখিত কিছু উপসর্গ স্পষ্ট ভাবে পরিলক্ষিত হয় তাহলে ধরে নিতে হবে সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এগুলো হলো- পরিবেশের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন বাস্তবতা এবং কাল্পনিক জগতের মাঝে ভিন্নতা উপলব্দি করতে না পারা। অস্বাভাবিক চিন্তাধারা। আবেগের অস্বাভাবিকতা। ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন। ইচ্ছাশক্তির পরিবর্তন। আচরণের পরিবর্তন। প্রত্যক্ষণের অস্বাভাবিকতা ইত্যাদি।

এই রোগে আক্রান্ত রোগীরা পারিপার্শ্বিক ব্যাপার ও নিজের সম্পর্কে একবারে উদাসীনভাবে প্রকাশ করে। কথাবার্তা জিজ্ঞেস করলে দু’এক কথায় উত্তর দেয়। এক জায়গায় চুপচাপ বসে থাকে, অসংলগ্ন, এলোমেলো এবং হেয়ালিপূর্ণ কথাবার্তা বলে, একা একা বিড়বিড়ি করে, হাসে, কান্না করে, কানে গায়েবি আওয়াজ শুনে এবং নানা ধরণের ভ্রান্ত বিশ্বাস এদের মাঝে বিরাজ করে। কাজেই সিজোফ্রেনিয়া রোগ যদি সন্দেহ হয়, তাইলে আজই অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

ডাঃ মোহাম্মদ ফিরোজ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

আপনার অভিমত জানানঃ