বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন আধুনিক বিজ্ঞানের পুরোধা

120 55 total views

বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন বিদ্যুৎশক্তিকে মানুষের দৈনন্দিন নানা কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে পথিকৃৎ। তাঁর জন্ম ১৮৪৭ সালে আমেরিকায়। বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত কৌতুহলী। তিনি নানা ধরনের যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করতে উৎসাহবোধ করতেন। তাঁর আবিষ্কার জগৎকে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। বিজ্ঞানকে করেছে সমৃদ্ধ।

১৯২৬ সালে বিজ্ঞানি আলফ্রেড নর্থ হোয়াইট হেড লিখেছিলেন, ১৯ শতকের বৃহত্তম আবিষ্কার হচ্ছে আবিষ্কারের পদ্ধতি উদ্ভাবন। তিনি আরও বলেছেন, ঐ পদ্ধতি পুরনো সভ্যতার ভিতকে ভেঙ্গে দিয়েছে। বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন নিজেকে কখনও বিপ্লবী হিসেবে ভাবতেন না। তিনি ছিলেন একজন কঠোর পরিশ্রমী। সমস্যা সমাধানকারী একজন বাস্তব মানুষ। তাঁর নিজের সমস্যার ব্যাপারে তেমন কোনো খেয়াল ছিলনা। তবে তাঁর যুগে তিনি ছিলেন বিস্ময়কর আবিষ্কারক। নতুন যুগের অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি হয়েছেন স্বীকৃত। নিউজার্সি গবেষণাগারে নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন করে বিষ্ময় সৃষ্টি করেছিলেন। এ কারণে তিনি মেনলো পার্কের জাদুকর এডিসন হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এডিসনের কার্যক্রমে ছিল এক ধরনের জাদু। তিনি অলীক কল্পণাপ্রবণ ছিলেন না। তিনি কোন ভুল নির্দেশনা দেন। তিনি কাজের সুবিধার্থে বৈদ্যুতিক চুম্বক ও বিদ্যুৎ শক্তিকে চাতুর্যের সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিরলসভাবে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া এবং সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কাজে লেগে থাকা। তাঁর বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, ‘প্রতিভা কোন জন্মগত বিষয় নয়। এটা হচ্ছে দুই শতাংশ অনুপ্রেরণা এবং ৯৮ শতাংশ পরিশ্রম।’ তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

মিচের পোর্ট হিউরণে ছেলেবেলায় এডিসনের বিরামহীন কাজ করার অভ্যাস গড়ে ওঠে। তাঁর আনুষ্টানিক শিক্ষা মাত্র তিন মাস স্থায়ী হয়। অর্থ্যাৎ স্কুলে তিন মাস লেখাপড়া করার পর শিক্ষকরা তাকে অথর্ব বলে আখ্যায়িত করলে তিনি স্কুল ত্যাগ করেন। তাঁর মা নিজেই ছিলেন শিক্ষিকা। তিনি বাড়িতে ছেলেকে লেখাপড়া শেখান। তাঁর ঝোঁক ছিল রসায়ন শাস্ত্রের দিকে। আর এ বিষয়ে তাকে ভালভাবে শিক্ষা দেয়া হয়।

পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য তাঁর অর্থের প্রয়োজন হয়। এ প্রেক্ষিতে ১২ বছর বয়সে তিনি ক্যান্ডি তৈরীর কাজ নেন এবং ব্যান্ড ট্রাঙ্ক রেলওয়েতে পত্রিকার হকারি করে অর্থ উপার্জন করেন। ১৬ বছর বয়সে তিনি টেলিগ্রাফ সম্পর্কে শিক্ষালাভ করেন এবং বিভিন্ন স্থানে অপারেটর হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। ১৮৬৮ সালে তিনি ওয়েষ্টার্ণ ইউনিয়নের বোষ্টন অফিসে চাকরি নেন। এখানে তিনি মিশেল ফেরাডের গবেষণাগারে বিদ্যুতের ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। সেখানে তিনি আবিষ্কারক হিসেবে পুরো সময় কাজ করেন। তখন এই ভোট রেকর্ডারের কোন চাহিদা ছিলনা। এতে তাঁর কোন অর্থ উপার্জিত হয়নি। এরপর বাজারে অচল এমন জিনিস আর কখনো আবিষ্কার করেননি। বাজারের চাহিদা নিশ্চিত হয়ে তিনি জিনিস আবিষ্কার করেছেন। এই অভিজ্ঞতা তিনি সারা জীবন কাজে লাগান।

১৮৭০ এর দশকে আমেরিকায় গৃহযোদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে এডিসনের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। ঐ সময় তিনি ঘড়ির স্টক টিকার আবিষ্কার করে ৪০ হাজার ডলার আয় করেন। এই অর্থ দিয়ে নিউইয়র্কে টিকারের দোকান করেছিলেন। অন্যান্য কোম্পানী কারিগরী সহযোগিতার জন্য এডিসনের দ্বারস্থ হয়। ১৮৭৬ সালে তিনি মেনলো পার্ককে বিশ্বের প্রথম শিল্প গবেষণাগারে পরিণত করেন। অনেকের ধারণা, এই মেনলো পার্কে এডিসন গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আবিষ্কার করেছেন।

১৮৭৭ সালে তিনি ফোনোগ্রাফ আবিষ্কার করেন। এই ফোনোগ্রাফই পরে গ্রামোফোন নামে পরিচিত হয়। তিনি টেলিগ্রাফীর সমস্যা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আলো, সঙ্গিত ও শব্দ সংযোজন করতে সক্ষম হন। অনেক চেষ্টা ও ভুল-ত্রুটির পর এডিসন ফোনোগ্রাফে মেরী হ্যাড ও লিটল ল্যাম্প সঙ্গীত বাজাতে সক্ষম হন। পরিদর্শকরা মেশিনে এই সঙ্গিত শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন। এভাবেই ফোনোগ্রাফের আবিষ্কার হয়।

টমাস আলভা এডিসনের সবচেয়ে বিখ্যাত আবিষ্কার হচ্ছে বৈদ্যুতিক বাল্ব। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা ১৮৭৯ সালে কার্বনাইজ সাদা বাতি তৈরি করেন। যা মাত্র ৪০ ঘন্টা জ্বলতে সক্ষম হয়। দীর্ঘ গবেষণার পর তিনি এতে সাফল্য লাভ করেন। তিনি জেনারেটরস মটর, জাংশন বক্স, সেফটি ফিউজ, আন্ডারগ্রাউন্ড কন্টাক্টসহ অনেক জিনিস আবিষ্কার করেন। মাত্র তিন বছর পর বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন লোয়ার ম্যানহাটনের পার্ল ষ্ট্রিটে প্রথম বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। ঐ সময় ৪’শ বাতি বিক্রি হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে তিনি রাতকে দিনে রুপান্তরিত করার প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন।

আরও পড়ুন- সিজোফ্রেনিয়া একটি মানসিক রোগ।

তিনি কঠিন টেলিফোন ট্রান্সমিটার আবিষ্কার করে টেলিফোন আবিষ্কারের সূচনা করেন। মুভি ক্যামেরা আবিষ্কারও তাঁর অন্যতম কীর্তি। এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রের বিকাশ ঘটে। এই আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তাঁর খ্যাতি জগৎজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এডিসনের অন্যতম অবদান হচ্ছে প্রযুক্তিগত পরিবেশ তৈরী করা। যা হোক, তিনি খ্যাতি ও সম্পদের ব্যাপারে যত্নবান ছিলেননা। অক্লান্তভাবে কাজ করে যাওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তিনি কখনই শিক্ষার আগ্রহ হারাননি। ১৯৩২ সালে তিনি পরলোকগমন করেন।

তাঁর আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে আধুনিক বিজ্ঞানীরা আরও উন্নত ও নতুন বিষ্ময়কর জিনিস উদ্ভাবন করেছেন। তাঁর প্রতিভা ও নিরলসভাবে কাজ করার ক্ষমতা তরুণ বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত ও উদ্দীপ্ত করে। তাঁর সৃষ্টিধর্মী কর্মকান্ড বিজ্ঞানকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পথিকৃত হিসেবে কাজ করছে। সেই অথর্ব বালকটি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করে দিবালোকের মতো ভাস্বর হয়ে রয়েছেন। অনাগতকালের মানুষ তাকে স্মরণ করে যাবে। এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

2 thoughts on “বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন আধুনিক বিজ্ঞানের পুরোধা”

আপনার অভিমত জানানঃ