ঢাকাই মসলিন শাড়ি : বাংলাদেশের ঐতিহ্য

120 45 total views

ঢাকাই মসলিন শাড়ি : বাংলাদেশের ঐতিহ্য || মনিরুজ্জামান মনির।

বসরার যেমন গোলাপ, হিমালয়ের যেমন দেবদারু, বস্ত্র-বয়ন শিল্প তেমন বাঙালীর নিজস্ব। এই উক্তিটি করেছিলেন দীনেশ চন্দ্র সেন। বয়ন শিল্পের প্রাণ হলো ঢাকাই মসলিন। এর সুতা তৈরি করা হতো ফুটি কার্পাস থেকে। আমাদের ঐতিহ্যের পরম আরাধ্য বস্তু মসলিন হারিয়ে গিয়ে ছিলো। অবস্থান নিয়ে ছিলো ইতিহাসের বিবর্ণ পাতায়। তবে খুশির খবর হলো, হারিয়ে যাওয়া মসলিন আবার ফিরে আসছে সগৌরবে।

হারানো মসলিনের সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনতে ৭ সদস্য বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ কমিটি ইতিমধ্যে কয়েকটি শাড়ী বোনে ফেলেছে। যার একটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী কিছু দিনের মধ্যে ঢাকাই মসলিন শাড়ি বাজারজাত করা যাবে। উল্লেখ্য, মসলিন ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের চতুর্থ ভৌগলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।    

আজ থেকে কয়েক হাজার বছর পূর্বে গ্রিক ব্যবসায়ীরা মসলিনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। রামায়ণের অযোধ্যার রাণী কৈকেয়ী তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বামীর কাছে বায়না ধরেছিলেন মসলিনের জন্য। হাজার বছর আগে প্রচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয় খাসনগর দিঘির তীরে ছিলো মসলিন কারিগরদের অবস্থান। সময়ে সোনারগাঁয়ের খাসনগর দিঘিরপাড় ছিলো উৎকৃষ্ট বস্ত্রের কেন্দ্রভুমি। সম্রাট আকবরের সভাকবি আবুল ফজল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আইন-ই আকবরিতে এ দিঘির কথা উল্লেখ করেছেন।    

সোনারগাঁয়ের দক্ষিণপূর্ব কোণে মেঘনার কূলেই বিদেশী বণিকদের বাণিজ্য জাহাজ ভিড়তো। ফারাওদের সমাধি মন্দির পিরামিডের মমির গায়ে পেঁচানো হতো বাংলাদেশের মহামূল্যবান মসলিন।

অষ্টম শতাব্দীর আরবীয় বণিক ‘সুলেমান’ কবুতরের ডিমের খোলসের ভেতর শত গজ মসলিন নিয়ে গিয়ে ছিলেন আরব ভূমিতে। মুঘল ইতিহাসবিদ আবুল ফজল উল্লেখ করেছেন, সুবেদার ইসলাম খান মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের জন্য সে সময়ে ২০ হাজার টাকার সোনারগাঁয়ের মসলিন পাঠিয়েছিলেন।

প্রাচীন বাংলার মসলিনের কয়েকটি নাম ছিলো, যেমন- মলবুস খাস, মলমল খাস, আবে-ই রওয়া, খাসসা। এসব মসলিন ইউরোপ ও রোম শহরের বিত্তশালী রাজপরিবারের কাছে রপ্তানী করা হতো।

আরও পড়ুন- চা শিল্পের ইতিহাস।

মসলিন কাপড় এত পাতলা ও সুক্ষ্ম ছিলো যে ইংরেজ রাজন্যবর্গ এবং বণিকরা মসলিন কাপড়কে ‘আকাশপরিদের’ তৈরী কাপড় বলে উল্লেখ করেছেন। আজ থেকে দেড় শত বছর আগে ‘ট্রপোগ্রাফি অব ঢাকা’র লেখক জেমস টেলর সোনারগাঁয়ের খাসনগরে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মসলিন তাঁতির বসবাসের কথা উল্লেখ করেছেন।

সোনারগাঁয়ের খাসনগর ছাড়াও ঢাকা, তিতাবদী, ডেমরা, বাজিতপুর এবং এগারসিন্দুরে মসলিন তৈরী হতো। জানা যায়, মসলিনের স্বর্ণযুগে প্রায় দেড় কোটি টাকার মসলিন ঢাকা থেকে রপ্তানি হয়ে ছিলো। কালক্রমে লন্ডনের যন্ত্রবিপ্লব এবং সহজলভ্য কাপড় তৈরির প্রতিযোগিতায় মসলিন হারিয়ে যায়। ইংরেজদের অমানুষিক নির্যাতনে মসলিন কারিগররা তাদের পিতৃপুরুষের পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় আত্মনিয়োগ করে। ফলে হারিয়ে গিয়েছিলো বাংলার কয়েক হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য ও গর্বের ধন মসলিন।

আপনার অভিমত জানানঃ