জাতীয় জীবনে ২৩ সংখ্যা

120 46 total views

জাতীয় জীবনে ২৩ সংখ্যা || ওয়াহিদুল ইসলাম মামুন।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়। যে ভূ-খন্ডটি নিয়ে আজ আমরা গর্বিত, তার পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। এই ভূ-খন্ডটি সেই ১২০৩ সাল থেকে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী থেকে শুরু করে ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পর্যন্ত প্রায় ৫৫৪ শতাব্দীকাল মুসলমানদের শাসনাধীন ছিল। এরপর ১৭৫৭ সালে নবাবের পরাজয় এবং ১৯০ বছর ইংরেজ শাসনের আবির্ভাব এবং ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তি ও ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্থানী শাসকদের যাতাকলে পিষ্ট এদেশের সাধারণ মানুষ।

কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম বিকশিত হয়েছে ১৭৫৭ সালের পর থেকে ১৮৫৭ এর সিপাহী বিপ্লব, বঙ্গভঙ্গ, ১৯৪৭ এর দেশ বিভক্তির সাথে ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, তিতুমীরের বিদ্রোহ, হাজী শরিয়তুল্লাহ, দুদু মিয়ার সংগ্রাম প্রভৃতি নানা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ ১৭৫৭ সালের পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর মেহেরপুরের ভবের পাড়ার আরেক আম্রকাননে উদিত হয়েছিল হারানো স্বাধীনতার সেই রক্তিম সূর্য। আমাদের এই দীর্ঘ সংগ্রামের প্রেক্ষাপট সূক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে আমরা এমন কিছু ঘটনা, সন ও তারিখের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছি যে তা কখনও ভুলবার নয়। ঠিক তেমনি একটি সংখ্যা বা তারিখ আমাদের কাছে খুবই স্মরণীয় তা’হল ২৩ (তেইশ)। নানা কারণে তারিখটি আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর তা আজ আমাদের আলোচ্য বিষয়।

মাত্র ২৩ বছর বয়সে ১৭৬৫ সালে সিংহাসন আরোহণ করেই নবাব সিরাজউদ্দৌলা অক্টোপাসের ন্যায় জড়িয়ে পড়েছিলেন বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে। ১৮৫৭ সালের এই ২৩ এপ্রিল ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কলকাতা কাউন্সিল নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য এক প্রস্তাব পাস করে। আর তারই ধারাবাহিকতায় ১৭৫৭ সালে সেই ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে পতন ঘটে নবাব সিরাজউদ্দৌলার।

এরপর শেষ হয় এক দাঙ্গা বিক্ষুব্দ ইতিহাস। যার ফলে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পথ ধরেই ১৯৪০ সালের সেই ২৩ মার্চ লাহোরের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হয়েছিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কন্ঠে মুসলিম হোমল্যান্ড প্রতিষ্টার ঐতিহাসিক বাণী লাহোর প্রস্তাব। সে প্রস্তাবের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল বাংলার স্বাধীনতার বীজ।

১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী সর্বপ্রথম পার্লামেন্টে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে গ্রহণ করার জন্য বিল আনেন গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান সহ মুসলিম লীগ সমর্থিত এমপিদের চরম বিরোধীতায় বিলটি বাতিল করা হয়।   

এ দেশের মানুষের ন্যায্য দাবী আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালের এই ২৩ জুন প্রতিষ্টা করা হয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তীতে অবশ্য ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামীলীগ নাম রাখা হয়েছিল।

১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার দাবীতে বিক্ষুব্ধ জনতাকে দমন করার জন্যে পুলিশের গুলিতে যে সমস্ত ছাত্র শহীদ হন তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে নির্মিত হয় শহীদ মিনার। ১৯৫২ সালের এই ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখেই শহীদ শফিউরের পিতা আনুষ্টানিকভাবে উদ্বোধন করেন ১২ ফুট উঁচু প্রথম শহীদ মিনার।

অন্যদিকে ১৯৫৬ সালে এই ২৩ মার্চ তারিখেই পাকিস্তানের খসড়া সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৯৫৬ সালের এই ২৩ মার্চই পূর্ব বাংলার নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান। এর পরবর্তীতে ১৯৬২ সালের এই ২৩ মার্চ তারিখেই প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খান সামরিক আইন প্রত্যাহার করে একটি শাসনতন্ত্র চালু করেন এবং এ সময় পাকিস্থানের রাজধানী করাচি থেকে ইসলামাবাদ স্থানান্তর করা হয়।

এদিকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ ও ম্যাগনাকার্টা বলে খ্যাত সেই ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ তারিখেই। ১৯৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে তোফায়েল আহমদ কর্তৃক ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রধান করা হয় ১৯৬৯ সালের এই ২৩ ফেব্রুয়ারী তারিখেই।

এরপর ১৯৭১ সালে সেই ২৩ মার্চ তারিখেই পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে ঘরে ঘরে স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশের একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালের সেই ২৩ মার্চ তারিখেই বাংলাদেশের গণপরিষদ এক আদেশ জারি করে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হবার পর বাংলাদেশের মহান স্থপতি ও জাতির জনকের গঠিত সেই সংঘঠন আওয়ামীলীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের সেই ২৩ জুন তারিখেই গঠন করে তাদের সরকার। একই দিন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রথম বারের মত প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন। এ দেশের মানুষের দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন করেন ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন তারিখেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সর্বশেষ মজার ব্যাপার হলো ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির স্মৃতি স্বরুপ নয়, পাকিস্তানী বর্বর শাসকদের হাত থেকে মুক্তির স্মৃতিস্বরুপ মেহেরপুরের মুজিবনগরের যে স্মৃতিসৌধ স্থাপন করেছেন চৌধুরী তানভীর কবির তাও কিন্তু এই ২৩ টি ফলক দ্বারা নির্মিত। এখানে তিনি ২৩ টি ফলকের দ্বারা পাকিস্তানী শাসকদের সেই (১৯৪৭-১৯৭১) দীর্ঘ ২৩ বছরের শাসন ও শোষণেরই ইঙ্গিত দিয়েছেন।

আরও পড়ুন- চা শিল্পের ইতিহাস।

তবে আমাদের এই মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্বাপর ঘটনা আরো সূক্ষ ভাবে বিশ্লেষণ করলে হয়তো আরো বহুবার দেখা যাবে জাতীয় জীবনে ২৩ সংখ্যা স্মরণীয় হয়ে জড়িয়ে আছে।

আপনার অভিমত জানানঃ