চা শিল্পের ইতিহাস

120 41 total views

চা শিল্পের ইতিহাস ।। আনিস-উর-রহমান আনিস

পানীয় হিসাবে চা’র খ্যাতি বিশ্বব্যাপী এবং অপ্রতিদ্বন্ধী। বাংলাদেশের রফতানী পণ্যের তালিকায় চা একটি উজ্জ্বল নাম। রফতানী পণ্যের তালিকায় পোষাক, পাট, চামড়া ও মৎস্যের পরেই চা’র স্থান। চা থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা উপার্জন হয়ে থাকে। বিশ্বে চা’র চাহিদা ও ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে চা’র বাজারও সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ সালে চা থেকে আয় হয়েছে ৩৪৭.১৪ মিলিয়ন টাকা। এ সময়ে চা’র রফতানী পরিমাণ ছিল ২.১৭ মিলিয়ন কেজি। এ থেকে অনুমেয়- চা শুধু সুস্বাদু পানীয় নয়, দেশের জন্য কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী রফতানী পণ্যও বটে।

চা শিল্পের ইতিহাস কবে থেকে শুরু হয়েছিল এই নিয়ে রয়েছে নানাজনের নানা মত। তবে, বিজ্ঞানীদের মতে ভারতের আসামে ইরাবতী নদীর অববাহিকায় চা গাছের আদি জন্ম। এখান থেকে চীন, ইন্দোচীন ও ইউরোপ চা গাছ ছড়িয়ে পড়ে। বাণিজ্যিক ভাবে চীনারা প্রথম চা উৎপাদন করে অর্থাৎ চা শিল্পের ইতিহাস রচয়িতা চীনারা। উপমহাদেশের বৃহত্তম ও সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক ভাবে প্রতিষ্টিত চা বাগান হচ্ছে বাংলাদেশের সিলেটে অবস্থিত মালনিছড়া চা বাগান। বাগানটি ১৮৪৭ মতান্তরে ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্টিত হয়। বর্তমানে ভারত, চীন, কেনিয়া, শ্রীলংকা, রাশিয়া, জাপান, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ প্রভৃতি দেশে চা’র চাষ হয়ে থাকে। তবে পৃথিবীর বিখ্যাত চা ভারতের দর্জিলিং এ উৎপাদিত হয়।

উপযোগী আবহাওয়া ও পরিবেশ না থাকলে চা’র চাষ করা যায়না। বছরে গড়ে ৯০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত, ৭৫ শতাংশ সূর্যালোক, ৫০ থেকে ৮০ ডিগ্রি ফরেনহাইট আদ্রতাপূর্ণ বায়ু চা চাষের জন্য প্রয়োজন। এই আবহাওয়া বিরাজমান থাকায় বাংলাদেশের সিলেট, চট্রগ্রাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম ও কুমিল্লা জেলার পাহাড়ী অঞ্চলে ব্যাপক চা চাষ হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মধ্যে সিলেটের জাফলং-এ উৎকৃষ্ট মানের চা উৎপাদিত হয়।

সরকারী ও বেসরকারি ভাবে বাংলাদেশে মোট ১৬৭ টি চা বাগান রয়েছে। জেলাওয়ারী পরিসংখ্যান মৌলভীবাজার- ৯১টি, হবিগঞ্জ- ২৫টি, চট্রগ্রাম- ২১টি, সিলেট- ১৯টি, পঞ্চগড়- ০৮টি, রাঙ্গামাটি- ০২টি, ঠাকুরগাঁও- ০১টি। ১৬৭টি চা বাগানের মোট জমির পরিমাণ হচ্ছে ২,৭৯,৫০৬.৮৮ একর। ১৬৭ টি চা বাগান থেকে বাংলাদেশে গত ২০২১ সালে প্রায় ৯ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার কেজি চা উৎপাদিত।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যানুসারে বাংলাদেশে সাধারণত ৫ ধরণের চা পাওয়া যায়। যথা- ১. গ্রিন টি বা সবুজ চা, ২. ব্লাক টি বা কালো চা, ৩. ওলোঙ্গ চা- এটি ব্লাক ড্রাগন চা নামে পরিচিত, ৪. ইন্সট্যান্ট টি (অর্থাৎ পানির সাথে দ্রবণীয় চা), ৫. হোয়াইট টি বাঁ সাদা চা। তবে বাংলাদেশে কালো চাই বেশী উৎপাদিত হয়। উদ্ভিদের প্রজাতি ভেদে চায়ের বর্ণের পার্থক্য হয়ে থাকে। চা গাছের শীর্ষ মুকুলের দু’টি কাঁচা পাতাই উৎকৃষ্ট। কারণ পরিফিনল ও উপক্ষার চা-কে সুস্বাদু ও সুগন্ধযুক্ত করে। পাতার বয়স বাড়লে চা’র মান তত নিম্নমানের হবে। প্রতি ৮ দিন থেকে ১০ দিন পর পর একটি গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করা হয়।

চা কেন এত জনপ্রিয়? এর ভিতরে এমন কী আছে যার জন্য মানুষ চা’র প্রতি এত আসক্ত হয়। জনাব আলির কথাই ধরা যাক। বয়স এখন তাঁর ৮০ ছুঁই ছুঁই করছে। পারিবারিকভাবে ছোটবেলা থেকে চা’র অভ্যাস। অভ্যাসটা এতই তীব্র যে, অন্যান্য খাদ্য না হলেও শুধু চা-তেই দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে পারেন বলে তিনি জানান। তার সঙ্গে আলাপ হলে তিনি আরও জানান যে, দিনে অন্তত ৫ কাপ চা তাঁর চা-চাই। তাঁর কথায় চা হচ্ছে আমার জীবন।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, চা পাতার মধ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। উপাদান গুলো হচ্ছে পলিফিনলের মধ্যে থাকে এক প্রকার উদ্বায়ী তেল, যার নাম ট্যামিন ও উপক্ষার। কাঁচা চা পাতার মধ্যে ট্যানিনের পরিমান থাকে ১২ থেকে ১৪ ভাগ। প্রক্রিয়াজাত করার পর ট্যানিনের পরিমাণ ৪ থেকে ৫ ভাগে দাঁড়ায়। তাছাড়া চা-তে রয়েছে রেজিনার নামক এক প্রকার পদার্থ, যা চা’র রঙকে লাল করে।

চা পান করা কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত? এ প্রসঙ্গে আধুনিক গবেষণায় প্রমানিত হয় যে, চা মানব দেহের জন্যে উপকারী। (১) চা দেহ ও মনের অবসাদ দূর এবং কাজে উদ্দীপনা জোগায়। (২) মাথা ধরা ও হৃৎপিণ্ড সজীবতায় চা উপকারী। এ জন্যে অনেক সময় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা হৃদরোগীদের কমপক্ষে সকালবেলা এক কাপ চা খেতে উপদেশ দেন। কারণ চা এর ক্যাফেইন ও প্রোটিন হৃদপিণ্ডের মাংসপেশিকে সতেজ রাখার অনূকুলে কাজ করে। কিন্তু এই চা’র আবার সময় ভেদে ক্ষতিকর কিছু কিছু দিকও রয়েছে। চা’র মধ্যে যে পলিফিনল আছে একথা আগেও বলা হয়েছে। এই পলিফিনল এর মধ্যে ক্যাফেইন ও ট্যানিন নামক দু’টি পদার্থ থাকে। আর ট্যানিন উপাদানটি আমাদের শরীরের জন্যে ক্ষতিকর। ট্যানিন চা’র ভেতর গুপ্ত অবস্থায় থাকে বলে তা ক্ষতিকর নয়। কিন্তু একটা বিশেষ সময়ে যখন চা থেকে ট্যানিন বের হয়ে আসে তখন শরীরের জন্যে তা ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, ট্যানিন মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্যান্সার সৃষ্টি করে থাকে। বিশেষ করে গলা, মাথা ও অন্ত্রে ক্যান্সার সৃষ্টিতে ট্যানিনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আবার চা’র সঙ্গে উচ্চ প্রোটিন জাতীয় খাদ্য খেলে এক ধরণের জটিল রাসায়নিক যৌগ তৈরী হয়। যা পরিপাক ক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায়।

চা বানানোর সঠিক নিয়ম হচ্ছে- একটি পাত্রে পানি গরম করুন। পানি ফুটতে শুরু করলে তাতে চা পাতা ঢালুন। তারপর আর পানি গরম করার প্রয়োজন নেই। ফুটন্ত পানির তাপেই চা থেকে প্রোটিন ফাইবার, ক্যাফেইন, উদ্বায়ী তেল, রেজিনার ইত্যাদি বেরিয়ে আসে। ফলে চা সুগন্ধ, সুবর্ণ এবং সুস্বাদু হয়ে থাকে। এই চা তে দুধ মিশিয়ে পান করাই উত্তম। এই নিয়মে চা বানিয়ে খেলে শরিরের জন্যে উপকারী। এই অবস্থায় ক্ষতিকারক ট্যানিন চা’র মধ্যে গুপ্ত অবস্থায় থাকে। কিন্তু ফুটন্ত পানিতে চা দিয়ে অধিক মাত্রায় তাপ দিতে থাকলে এই চা খাওয়া থেকে ক্ষতিকারক ট্যানিন খাওয়াই ভাল। কারণ দুধে ক্যাসিল নামক পদার্থ ট্যানিনে আঁকড়ে ধরে রাখে এবং শরীরের সঙ্গে মিশতে বাঁধা দেয়। আগেই বলেছি ট্যানিন মানব দেহে ক্যান্সারের জীবাণু বিস্তার করে।

চা পান সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ন কথা হচ্ছে; অনেকের একটি অভ্যাস আছে গরম চা তে ফুঁ দিয়ে পান করার। কিন্তু ফুঁ দিয়ে চা পানের একটি খারাপ দিক রয়েছে। তা হচ্ছে, গরম চা থেকে যে বাষ্প ওঠে তাতে অক্সিজেন থাকে। আর আমাদের ফুঁ’র সঙ্গে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেরিয়ে আসে। অক্সিজেন এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মিশ্রণ মানব দেহে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই কার্বন মনো অক্সাইডের পরিমাণ খুবই সামান্য বলে তাৎক্ষণিক বড় ধরণের বিষক্রিয়া হয়না। কিন্তু এটা শরীরের জন্যে ক্ষতিকর। চা বানানো এবং চা খাওয়া সম্পর্কে সামান্য সচেতন হলেই চা’র ক্ষতিকর দিকগুলো পরিহার করা সম্ভব।

আপনার অভিমত জানানঃ