ইবনে বতুতার কবর

120 1 total views

ইবনে বতুতার কবর ।। অম্লান দেওয়ান

উত্তর আফ্রিকার মরক্কোর প্রান্তবর্তী একটি শহর তানজির। তানজিরের পশ্চিমে প্রান্তসীমায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে আটলান্টিক আর ভূমধ্যসাগরের বিভাজন রেখা। একটু সচেতন দৃষ্টি দিলেই পরিষ্কার দেখা যায় দু’টি মহাসাগরের পানির দু’রকম রঙ। আটলান্টিকের শ্বেত শুভ্র বিস্তৃত জলরাশির সাথে তাল মিলিয়ে বয়ে চলেছে ভূ-মধ্য সাগরের সাদা গভীর জলরাশি। দূরে নীলাকাশ যেন বাঁধা পড়েছে দিগন্তে। এখানে সবুজ বৃক্ষ আছে। আছে প্রাচীন ঐতিহ্যিক আরব সংস্কৃতির নানা উপকরণ।

তথ্য এলো, এই অনিন্দ্য সুন্দর শহরেই রয়েছে বিশ্বখ্যাত পযর্টক ইবনে বতুতার কবর। তাঁর পূর্ণ নাম- আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে যিনি ভারত সফরে এসেছিলেন। সফরে এসে এ উপমহাদেশকে ভালবেসে থেকে গিয়েছিলেন দুই দুইটি দশক। দিল্লীর সুলতান মোহাম্মদ বিন তুঘলক নাকি তাঁর ইসলামী পান্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে নিযুক্ত করেছিলেন রাজদরবারের উপদেষ্টা হিসেবে। এক ঝলক বিদ্যুৎ যেন নাড়া দিয়ে গেলো নিউরণকে। যে করেই হোক ইবনে বতুতার কবর ঘুরে আসা চাই।

অতঃপর এক রোদেলা দুপুরে বেরিয়ে পড়া ইবনে বতুতার কবরের সন্ধানে। খোদ তানজির শহরেই ইবনে বতুতা এত কম পরিচিত- অবাক করা বিষয়ই বটে। শহরে হাঁটতে হাঁটতে প্রায়ই মনে হচ্ছিলো একটি বাংলা প্রবাদ- গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। অবশেষে বিশোর্ধ এক তরুণের সহায়তায় সন্ধান মিললো ইবনে বতুতার কবরে যাবার রাস্তা।

তরুণটির নির্দেশিত পথে খানিকটা এগুতেই চোখে পড়লো বিশাল এক তোরণ। তোরণ পার হলেই অসংখ্য দোকানের সারি। দু’ধারে সারিবদ্ধ দোকানের পাশাপাশি হকারও রয়েছে। কোন কোন দোকানে বিক্রি হচ্ছে আরব ঐতিহ্যিক কার্পেট। এক সময় দোকানপাটের সারির শেষ হয়। দৃশ্য হয় কিছু ইটের একতলা বাড়ি। দু’ধারেই বাড়ির সারি। যদিও বাড়িগুলো একই লেভেলে না। ফলে কয়েকধাপ এগুলেই ২০/২১ টা সিঁড়ি পেরুতে হয়। আবারো সিঁড়ি এবং এভাবেই। বাড়িগুলোর কোনটি থেকে শিশুর কান্না ভেসে আসছিলো। কোনটি থেকে শোনা যাচ্ছিলো স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া এবং ভাই বোনের চেঁচামেচি। চা-নাস্তা সামনে নিয়ে আড্ডারত অবস্থায় দেখা গেছে কয়েক পরিবারের সদস্যদের।

দিনটি ছিলো শনিবার। ছুটির দিন। প্রত্যেক বাড়ির দরজাই ছিলো উন্মুক্ত। বোঝা গেলো এরা পরস্পর নির্ভরশীল। এভাবে মিনিট পাঁচেক এগুতেই মুখোমুখি এক যুবতীর। জিজ্ঞেস করা হলো…….. ইবনে বতুতার কবরটা কোথায় যেনো………। এক গাল রজনীগন্ধা হাসি দিয়ে ইশারায় অপেক্ষা করতে বলে তরুণীটি ভিতরে ঢুকে গেলো। সঙ্গে নিয়ে বেরুলো এক বৃদ্ধাকে। বৃদ্ধার নির্দেশ মতো প্রবেশ করি মার্বেল পাথরে বাঁধানো ১৪/১০ ফুট একটি কক্ষে। দেওয়ালে ঝুলছে আরবি ভাষায় লেখা ইবনে বতুতার জীবন, কুরআনের আয়াত ইত্যাদি। ছবি তুলতে চাইলাম। বৃদ্ধা ইশারায় বাঁধা দিলেন। পকেট থেকে ৫০ দিরহামের একটি নোট বৃদ্ধার হাতে গুঁজে দিয়ে বলা হলো ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশ থেকে এসেছি। যে অঞ্চলে ইবনে বতুতা কাটিয়েছেন তাঁর জীবনের সুদীর্ঘ সময়। অবশেষে বৃদ্ধার মন গললো। বৃদ্ধা ছবি তোলার অনুমতি দিলেন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠলো কয়েকবার। সামান্য অহংকার দানা বাঁধলো হৃদয়ে। নীরবে কয়েক মিনিট অবস্থান করলাম সেখানে, যেখানে কফিনের সাদা মোড়কে সাজানো, শুয়ে আছেন ইবনে বতুতা। মাটির গহীনে, গহন স্তব্ধতায়। বস্তুতঃ আমার শারীরিক উপস্থিতি অবাক করলো আমাকেই। স্তব্ধ করলো কিছুক্ষণের জন্যে। যে স্তব্ধতা আকস্মিক রুপান্তরিত হয়, হয়ে যায় বীজ এবং রক্ষিত হয় হৃদয়ের গোলাঘরে।

আপনার অভিমত জানানঃ